রেমিট্যান্স আসে, পাসপোর্ট আসে না!

নিয়াজ মাহমুদ

রাষ্ট্রের কাছে প্রবাসীরা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটের সময়, গুরুত্বপূর্ণ। রিজার্ভ কমে গেলে, গুরুত্বপূর্ণ। ডলারের সংকট দেখা দিলে, গুরুত্বপূর্ণ। বক্তৃতার মঞ্চে তারা ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’। জাতীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি। দেশের গর্ব। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর কি রাষ্ট্র দিতে পারবে?

যে মানুষটি প্রতি মাসে দেশের ব্যাংকে ডলার পাঠান, তিনি নিজের দেশের একটি বৈধ পাসপোর্টের জন্য কেন মাসের পর মাস অপেক্ষা করবেন? কেন তার চাকরি যাবে? কেন তার ভিসার মেয়াদ শেষ হবে? কেন তিনি বিদেশের মাটিতে অবৈধ অভিবাসীর ঝুঁকিতে পড়বেন? আর কেন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হবে? এটাই আজকের বাস্তবতা।

হাইকোর্ট বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের ঝুলে থাকা নতুন পাসপোর্ট ও নবায়নের আবেদন ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, সে মর্মে রুল জারি করেছেন। আদালত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও নির্দেশ দিয়েছেন, বিশ্বের বাংলাদেশ মিশনগুলোকে দ্রুত আবেদন পাঠানোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে। প্রশ্ন হচ্ছে, আদালত কি পাসপোর্ট অফিস চালাবে?

একটি রাষ্ট্রে আদালতের কাজ নীতি নির্ধারণ নয়, বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন প্রশাসন নিজের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তখন আদালতকে এগিয়ে আসতেই হয়। এই ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং এটি বলে দিচ্ছে, কোথাও না কোথাও রাষ্ট্রের সেবাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

আজ একজন প্রবাসীর কাছে পাসপোর্ট কেবল একটি বই নয়। এটি তার চাকরি। তার বৈধতা। তার পরিবারের ভবিষ্যৎ। তার সন্তানের লেখাপড়ার খরচ। তার ব্যাংক হিসাব। তার বেঁচে থাকার নিরাপত্তা।

এই একটি নথি সময়মতো না পাওয়ার কারণে কত মানুষ চাকরি হারিয়েছেন? কতজন ভিসা নবায়ন করতে পারেননি? কতজন দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন? কতজন বিদেশে জরিমানা বা আইনি জটিলতায় পড়েছেন? এই সংখ্যাগুলো কি সরকারের কাছে আছে?

থাকার কথা। যদি না থাকে, সেটাও ব্যর্থতা। আর যদি থেকেও থাকে, তাহলে এতদিন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? দূতাবাস বলছে, আবেদন ঢাকায়। ঢাকার দপ্তর বলছে, প্রক্রিয়াধীন। কোথাও প্রিন্টিংয়ের অজুহাত। কোথাও সার্ভারের অজুহাত। কোথাও জনবলের অজুহাত। কিন্তু একজন প্রবাসী অজুহাত দিয়ে চাকরি বাঁচাতে পারেন না। বিদেশের ইমিগ্রেশন বিভাগও অজুহাত শোনে না। তারা দেখে একটি বৈধ পাসপোর্ট আছে কি নেই। এখানেই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা সবচেয়ে স্পষ্ট।

২০২৪ সালে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এক বছরে বিদেশে গেছেন ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি। চলতি বছরও সেই ধারা অব্যাহত। অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রার উৎসগুলোর একটি এখন প্রবাসীরা।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে যারা অর্থনীতি সচল রাখছেন, তাদের জন্য একটি আধুনিক, দ্রুত এবং জবাবদিহিমূলক পাসপোর্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এত বছর লাগছে কেন?

প্রযুক্তির যুগে একটি আবেদন কোন টেবিলে আটকে আছে, সেটিও যদি আবেদনকারী জানতে না পারেন, তাহলে ডিজিটাল সেবার দাবি কতটা বাস্তব?

আরও বড় প্রশ্ন আছে। প্রবাসীদের নিয়ে এত সভা-সেমিনার হয়। এত নীতিমালা হয়। এত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র কেন বদলায় না? সমস্যাটা কি শুধু প্রযুক্তির? নাকি সমন্বয়ের? নাকি জবাবদিহির অভাব? নাকি এমন একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে নাগরিকের ভোগান্তি কারও কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সরকারকেই দিতে হবে।

হাইকোর্টের নির্দেশ স্বস্তির। হাজারো মানুষ হয়ত উপকৃত হবেন। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ আদালত প্রতিটি পাসপোর্ট আবেদন তদারকি করবে না। সেটি প্রশাসনের কাজ। আর প্রশাসনের প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত দক্ষতা, জবাবদিহি এবং সেবার মান।

রাষ্ট্রেরও মনে রাখা দরকার, প্রবাসীরা অনুদান পাঠান না। তারা কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্জিত অর্থ দেশে পাঠান। সেই অর্থে চলে লাখো পরিবার। শক্তিশালী হয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। অর্থনীতির সংকটে বারবার তারাই ভরসা হয়ে দাঁড়ান।

অথচ সেই মানুষগুলোই যদি একটি পাসপোর্টের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন, তাহলে সমস্যা কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নির্ধারণেরও প্রশ্ন।

প্রশাসনের কাছে এখন দুটি পথ খোলা। একটি হলো, আদালতের নির্দেশ মেনে কিছুদিন দ্রুত কাজ করে আবার আগের গতিতে ফিরে যাওয়া।

অন্যটি হলো, এই সংকটকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করে পুরো ব্যবস্থার সংস্কার করা। নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া, আবেদন ট্র্যাকিং শতভাগ স্বচ্ছ করা, দূতাবাস ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মধ্যে ডিজিটাল সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং অকারণ বিলম্বের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা। দ্বিতীয় পথটিই রাষ্ট্রের জন্য সম্মানজনক।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সাধারণ। প্রবাসীদের আমরা কি শুধু ডলারের উৎস হিসেবে দেখব? নাকি পূর্ণ অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে দেখব?

উত্তরটি শুধু সরকারের নয়, রাষ্ট্রেরও। কারণ একটি দেশের মর্যাদা কেবল তার রিজার্ভের অঙ্কে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয়, সে তার সবচেয়ে অবদান রাখা নাগরিকদের কতটা সম্মান, সুরক্ষা এবং সেবা দিতে পারে।

রেমিট্যান্স সময়মতো আসে। এখন সময় রাষ্ট্রও সময়মতো তার দায়িত্ব পালন করুক।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন